ছুটির দিনে কোথাও বেরনোর হাজার হ্যাপা। সুদত্তার কাছে হাজার রকমের জবাবদিহি করতে হয়। তাতে অবশ্য আপত্তি নেই নিখিলেশের। কিন্তু আজ সে কোথায় যাচ্ছে, সেটা সে এখনই সুদত্তাকে জানাতে চায় না। রাতে ফিরে একটা সারপ্রাইজ দেবে। তাই বাড়ি থেকে বেরনোর সময় নিখিলেশের মুখে কুলুপ, আর তাতেই গোঁসা সুদত্তার। শুধু একবার মুখ মেঘলা করে বলল, 'এখন তোমার এমন সব ব্যাপার আছে যা আমাকে বলা যায় না।'
অন্যদিন সে নিখিলেশকে বারান্দা থেকে হাত নাড়ে আজ তিনতলার বারান্দার দিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না নিখিলেশ।
বেহালা ট্রাম ডিপোর কাছে এসে সে একটা বাসে চেপে বসল। তার গন্তব্য ব্রহ্মপুত্র। সে ঠিক করেছে, বেহালার ছোট্ট ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে দেবে। তার বদলে ওদিকে একটা জমি কিনে বাড়ি বানাবে। ওদিকটা বেশ। সুবিনয়ই ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। এসব ভাবতে ভাবতে নিখিলেশ দেখল এক ভদ্রমহিলা একটা বাচ্চা নিয়ে বাসে উঠলেন। বাসে আর একটাও সিট নেই। মিহিলা বাসের হ্যান্ডেল ধরে বাচ্চাকে সামলাতে গিয়ে টলমল করতে লাগলেন। আহা রে, নিখিলেশ বাচ্চাটাকে হাত দিয়ে টেনে নিয়ে নিজের কোলে বসাল। মহিলা 'থ্যাংক ইয়ু' বলে ভালো করে বাসের রড ধরে দাঁড়ালেন।
একটু পরেই নিখিলেশ বুঝল মোক্ষম ভুলটাই সে করেছে। বাচ্চাটা একেবারে বিচ্ছু। একবার নিখিলেশের গাল টিপে দেয়, একবার গোঁফ ধরে টানে, একবার তার পকেট থেকে পেন আর মোবাইল টেনে বার করতে চায়। একবার তো তার জামার মধ্যে তার ভিজে নাকটা ঘষে দিল। কিছুই বলতে পারে না নিখিলেশ। শুধু একবার বোকার মতো হাসে আর বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়ে। যেন বলতে চায়, 'ছিঃ, এমন করে না'। মহিলা মানে ওর মা ছেলেকে নিষেধের ঢংয়ে বলেন, 'নাঃ সোনা অমন করে না'। বাচ্চাটি একেবারে নাছোড় নাঃ আমি মোবাইল নেব।'
চশমা, মোবাইল, পেন এত সবকিছু নিখিলেশ একা সামলাতে পারে না। একটু পরেই মোবাইল বেজে ওঠে, 'আকাশ ভরা সুর্য তারা'র সুর। ফোনের মনিটরে নিখিলেশ দেখল, সুদত্তার ফোন। ফোনটা অন করে সে বলল, 'বল...'
ঠিক সেই সময় বিচ্ছুটা ফোনে মারল হ্যাঁচকা টান। বলল, 'বাবা আমায় ফোনটা দাও।'
নিখিলেশ বলল, 'আঃ ছাড়, কথা বলতে দাও।'
মহিলা ছেলেকে বললেন 'আঃ সোনা আবার বিরক্ত করছ! ছেড়ে দাও বলছি।'
ফোনের ওদিকে সুদত্তা গম্ভির। তার মানে এদিকের সবকথা শুনেছে। একটু পরে সে বলল, 'ও, এই জন্য আমায় বলা যাচ্ছিল না কোথায় যাবে। তা তোমার এই স্ত্রী-পুত্রটি কোথাকার।'
-'যা কি যা তা বলছ ?'
- 'আমি যা তা বলছি ? আমি স্পস্ট শুনলাম তোমাকে 'বাবা' বলল। আর একজন মহিলা তাকে সামলাল।' বলেই ওপাশ থেকে ফোনটা কেটে দিল সে।
হতভম্ব নিখিলেশ বন্ধ ফোনের আলো জ্বলা মনিটরের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল, 'যাঃ গেরো !'
|