• Increase font size
  • Decrease font size
  • Default font size
Kolkata in pictures
 Bangla font help

বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল
পুন্য হউক, পুন্য হউক, পুন্য হউক হে ভগবান।
বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাটি
পুন্য হউক, পুন্য হউক, পুন্য হউক হে ভগবান।
বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা
সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক হে ভগবান।
বাঙালির প্রান, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন
এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান ।

                                                                 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 
সুখ চাই

শাওন পরিচয়

আলো অকৃপন বলেই আমির আলি এভিনিউর আর পাঁচটা বাড়ির মত ছেটো বাড়িটার চিলে কোঠায় হাজির হয়েছে। এলাকার অনেক মানুষ তখন ঘুমিয়ে। পিনাকেশের এ অভ্যাস কোনো দিনও নেই। বরং কাকভোরের আলোকে সম্ভাষণ করা তার জীবনে দৈনন্দিন ঘটনা।

এখনো শীত দাঁত ফোটাচ্ছে শহর জুড়ে। পিনাকেশ বিছানা ছেড়ে নিয়ম মাফিক জানালাটা খুলে দিল। একটু পরেই মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে গেল। বাড়িতে ছেলে, ছেলের বউ, একমাত্র স্কুল পড়ুয়া নাতি তখনো তাদের বিছানায় ঘুমিয়ে আছে। পিনাকেশ বিপত্মীক ও রিটায়ার্ড মানুষ।

পিনাকেশ সাড়ে সাতটায় মর্নিং ওয়াক থেকে বাড়ি ফেরে। ততক্ষণে বাড়ির ঝি এসে বৌদিমনি চন্দ্রিমার বিছানা ছাড়িয়াছে। রঞ্জনের আজও অফিস তাই চন্দ্রিমা ঝি-এর সাথে রান্নার কাজে ব্যাস্ত। পিনাকেশ ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসে এবং ডেস্কের ড্রয়ার থেকে শিক্ষাশ্রমের ফাইলটা বের করে তার নথি ঘাঁটতে থাকে। পিছন থেকে ঝি-টি এক কাপ চা নিয়ে সামনে টেবিলের একধারে রেখে বলে "কাকাবাবু আপনার চা"।

পিনাকেশ বাড়ি ফেরার পর চন্দ্রিমা আর রঞ্জনের মধ্যে একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। চন্দ্রিমা বলে বসে- বাবাকে কথাটা বলবে না?

রঞ্জন চা-য়ে আলতো চুমু দিয়ে পালটা বলে- কথাটা তো তুমি বলতে পারো।

- দেখো বাবার হাবভাব আমার ভালোলাগে না, তুমি বরং বাবাকে একটু সময় দাও। এটা ওটা বলার ফাঁকে কথাটা বলে ফেলো।

- তুমি বললে অসুবিধা কোথায়?

- আমাকে যদি না করে দ্যান - এ অপমান 'আমি নিতে পারব না।

- এতে অপমানের কি আছে, ভালো লাগে টাকা দেবেন, না লাগে না দেবেন।

- না, তুমিই বলো। আমি বরং বাবার পছন্দসই একটা টিফিন বানাই। চন্দ্রিমা এক রকম ঠেলা দিয়ে রঞ্জনকে বাবার ঘরে পাঠিয়ে দিল।

রঞ্জন ঘরে ঢুকে দেখলো বাবার ঘুম ছাড়া বিছানাটা অগোছালো। পোশাকগুলো বাদুড়ের মতো দেওয়ালের হুকে ঝুলছে; যার বেশ কয়েকটা সাবান জলে ধোয়া প্রয়োজন। চন্দ্রিমা ঝি-কে দিয়ে পিনাকেশের পোশাক সাফ করায়। ঝি কখনো সখনো এ সপ্তাহের ধোয়া ও সপ্তাহে ফেলে রাখে। রঞ্জন দেখল বাবা একটা ফাইল খুলে কিছু দেখছে, পিছন থেকে এগিয়ে এসে সে বাবাকে জিজ্ঞেস করে - বাবা তুমি কি এখন ব্যাস্ত আছো?

পিনাকেশ আচমকা ঘাড় ফিরিয়ে উত্তর করে - না, তেমন কিছু না। কেন কিছু বলবি?

- একটু কথা ছিল।

পিনাকেশ ফাইল-টা বন্ধ করে বলে - কিছু বলার থাকে বল, তোর সাথে আর কথা হয়ে ওঠো না। সকালে তোর অফিস । আমিও সন্ধ্যায় এখানে ওখানে বেড়িয়ে পড়ি। তা বল।

- বউমা কিছু টাকার কথা বলছিল।

পিনাকেশ রঞ্জনের দিকে এক দৃষ্টে তাকায় এবং জিজ্ঞেস করে-কত টাকা?

পিনাকেশের প্রশ্নে রঞ্জন কিছুটা সংকোচ বোধ করে। টাকার অঙ্কটা বলতে তার দেরি হয়। ততক্ষণে চন্দ্রিমা পিনাকেশের জন্য টিফিন নিয়ে এসে পড়ে। পিনাকেশ বউমাকে দেখে তাকেই আবার জিজ্ঞেস করে- বউমা তোমার কত টাকা চাই?

চন্দ্রিমা পিনাকেশের সামনে টিফিনের প্লেট রাখতে রাখতে বলে, দু-লাখের মত হলে হবে।

পিনাকেশ বেশ অবাক হয় এবং জানতে চায়- এত টাকা কি করবে?

- একটা ফোর হুয়িলার কিনবো তাই।

- ফোর হুয়িলার! কিন্তু এতো সবের দরকার কি?

চন্দ্রিমা তাকে বোঝাবার চেষ্টা করে- বুবুনদের স্কুলে প্রায় সকলে নিজেদের গাড়িতে করে আসে। তা ছাড়া ট্রামে বাসে বাচ্চা নিয়ে যা অবস্থা হয়, তাতে করে...

রঞ্জন কোনো কথা বলে না। তার শরীরে একটা সংকোচ ক্রমেই স্পষ্ট হয়। সে তুলনায় চন্দ্রিমা অনেক বেশি সপ্রতিভ।

পিনাকেশ পাল্টা জবাব দেয়- অনেকেই বাসে ট্রামে বাচ্চা নিয়ে নিরাপদে স্কুল যায়। যদি দেরি হয় কিছুটা আগে বেরুলেই হবে।

রঞ্জন পিনাকেশকে কিছু একটা বলবে এই ইচ্ছায় চন্দ্রিমা পাল্টা কিছু বলে না। রঞ্জনও পিছনে বাবার বিছানায় বাধ্য মানুষের মতো বসে পড়ে। অবস্থা বিপরীত দেখে চন্দ্রিমা হাল না ছেড়ে বলে- আপনার প্রভিডেণ্ড ফাণ্ডের এত টাকা নিয়ে আপনি কি করবেন। সেই তো আমাদেরই থাকবে। তাছাড়া সেই তো আমরাই আপনাকে দেখবো।

শেষের কথাগুলো পিনাকেশের গায়ে লাগে। তাড়াতাড়ি উত্তর দেয়। - ও টাকার কাজ আছে। মাত্র তো চার লাখ টাকা। তাছাড়া তোমার শ্বাশুড়ির চিকিৎসা আর বাড়ি মেরামতের কাজে আগেই অর্ধেক টাকা ব্যায় হয়ে গেছে। সে তো রঞ্জন জানে।

- তুমি এতগুলো টাকা রেখেই বা কি করবে? রঞ্জন এবার মুখ খোলে।

পিনাকেশ একটু ভেবে নিয়ে বলে- জানতে চাও। তা হলে শোনো। এ টাকার মধ্যে তিন লাখ টাকা একটা অনাথ আশ্রমে দান করব বলে আশ্রমের কর্তৃপক্ষকে কথা দিয়েছি। কন্যা দায়গস্থ এক বাবাকে হাজার চল্লিশ টাকা দেব  ঠিক করেছি। বাকিটা নিজের টুকিটাকি খরচ হবে। তোমাদের দেবার মতো টাকা কোথায়। যদি চাও আমার খরচের জন্য টাকাটা তোমরা নিতে পারো। আমার আপত্তি নেই।

রঞ্জন আর ঠিক থাকতে পারে না, কিছুটা উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং বলে- এতগুলো টাকা তুমি অনাথ আশ্রমে দান করছো আমাদের বঞ্চিত করে।

সাথে সাথে চন্দ্রিমাও হতবাক হয়। তার চোখে মুখে একটা চাপা তীব্র ক্রোধ ফুটে ওঠে। সে বলে বসে- অদ্ভুদ ব্যাপার! ঘর-কে মেরে পরকে বাঁচানো।

পিনাকেশ তাদেরকে শান্ত করার চেষ্টা করে- তোমরা হয়তো রাগ করছো আমার ওপর। কিন্তু এই আশ্রমটার একটা ভাল স্কুল বিল্ডিং দরকার। অনেক অনাথ ছেলে মেয়ে ওখানে বেড়ার ঘরে পড়াশুনা করে। ঝড় বৃষ্টিতে ওরা কষ্ট পায়।

চন্দ্রিমা কিছুটা কাতর হয়ে বলে- কিন্তু টাকাটা তো এখনো দিয়ে দ্যান নি।

পিনাকেশের সদৃঢ় উত্তর- না, কিন্তু কথা যখন দিয়েছি, তখন দিতেই হবে।

রঞ্জন জোর দিয়ে বলে- তা, কিছু কম দিলে পার, এক লাখের মতো।

পিনাকেশের উত্তর- স্কুলটা করতে পাঁচ লাখের মতো ব্যায় হবে। আপাততঃ আমার তিন লাখ ওদের মূল ভরসা।

চন্দ্রিমা পিনাকেশের কথা শোনা আর প্রয়োজন বোধ না করে সক্রধে ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেল। রঞ্জন ঘর থেকে বেরোবার আগে বলে গেল- তোমার টাকা তুমি বোঝো।

পিনাকেশ যে ফাইলটা দেখছিল, সেটাতে পুরুলিয়া জেলার একটা অনাথ আশ্রমের এ্যানুয়াল রিপর্ট, অডিট রিপর্ট, আশ্রমের বিভিন্ন কাজকর্মের ফোটোকপি ইত্যাদি গোছানো। রঞ্জন চলে যাবার পর সেটা বন্ধ করে দেয়। পরে চেয়ারটা একটু ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দ্যাখে সকালের আলো এখন অনেক বেশী পরিবেশকে ঢেকে দিয়েছে। পাশের কর্মব্যস্ত রাজপথে গাড়ী আর চলমান মানুষের স্রোত। এখানে পিনাকেশ যেটা অনুধাবন করে- আকাশের নীচে এই মুক্ত আলো বাতাস মানুষ জগতের সবকিছু যেন একে অপরের পছন্দ অপছন্দ উপেক্ষা করে কেবলমাত্র নিজের স্বার্থপুরণে ব্যস্ত। ব্যস্ত মানুষের স্রোতের পিছনে স্বার্থপূরণের একটা ছুটন্ত লেজ। দেখতে দেখতে বেলা বেড়ে গেছে। রঞ্জন নিজের কাজে বেরিয়ে গেল। বউমা বাচ্চা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে তার সাথে। একটু পরে ঝি মেয়েটি কেটে পড়বে। তখন পিনাকেশের জন্য টেবিলে ঢাকা খাবার-টাই অপেক্ষা করে থাকে।

 দুই

স্কুল থেকে বাচ্চা নিয়ে চন্দ্রিমা যখন ঘরে ফেরে পিনাকেশ তখন তার নিজের ঘরে শুয়ে। চন্দ্রিমা এ সময়ে নিয়মমাপিক তার শ্বশুরকে চা আর জলখাবার দেয়। পিনাকেশও এ সময়ে তার একমাত্র নাতিকে নিয়ে আদর আর হাসিঠাট্টা করে। বুবুন সে সময় দাদুর গা মাথা চড়ে নেয়। বউমা ও নাতি ঘরে ফিরেছে দেখে পিনাকেশ উঠে চেয়ারে বসে। চা-জলখাবার আর নাতির হাজিরার বিলম্ব দেখে সে ড্রয়িং রুমে চলে আসে। ততক্ষণ বউমা তার ছেলেকে নিয়ে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। পিনাকেশের একটা খটকা লাগে। সে চন্দ্রিমার ঘরের সামনে গিয়ে নাতিকে ডাকে,- দাদুভাই বাইরে এসো।

পিনাকেশের ডাকের কোনো উত্তর আসে না। সে এবার দরজায় কয়েকবার ঘা দেয় আর নাতিকে ডাকে। কিন্তু বউমা বা বুবুন কেউই সাড়া দিল না। পিনাকেশ সকালের ঘটনা স্মৃতিচারণ করে কিছু একটা অশুভ অনুমান করে। এবার সে বউমাকে ডাকে,- বউমা সাড়া দিচ্ছ না কেন। দাদুভাইকে আমার কাছে পাঠাও।  কিন্তু কোনো উত্তর না পেয়ে পিনাকেশ নিজের ঘরে ফিরে যায়।

এ পরিস্থিতিতে মানুষ কিছুটা দুমড়ে মুচকে যায়। তাই পিনাকেশ আর বাড়াবাড়ি না করে নিজের খাটে পা ঝুলিয়ে ঠায় রইল বেশ কিছুক্ষণ। পরে আজ একটু আগে সন্ধ্যার আড্ডায় বেরিয়ে গেল। তবে মনটা অন্যদিনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।

সন্ধ্যার পর রঞ্জন ফিরে এলে চন্দ্রিমা বলল- দ্যাখো, এ সংসারে আর সুখ নেই। এতগুলো টাকা তোমার বাবা নয় ছয় করছেন।

- নয় ছয় করতে দাও, পরে বোঝাবো।

- দ্যাখো, তোমার বাবাকে আমি আর সেবাযত্ন করতে পারব না।

- অসুবিধা মনে করলে বাবার সমস্ত কিছু ঝি-কে দিয়ে করাবে।

- কিন্তু এখানে থাকলে তো চোখাচুখি করতে হবে। আমার দ্বারা সম্ভব নয়।

- তা ছাড়া উপায় কী।

- অন্য কোথাও একটা ঘর নাও। চাও-তো তুমি তোমার বাবাকে এসে দেখে যাবে।

রঞ্জনের মধ্যে একটা আলতো হতাশা ফুটে ওঠে সে বলে- কিন্তু আমরা যে অবস্থায় থাকি এ রকম ঘরের ভাড়া অনেক। আমার মতন একজন ক্লার্কের ক্ষেত্রে টানা কি সম্ভব? তা ছাড়া বাবার পেনশানের কিছুটা টাকা তো আমাদের সংসারে খরচ হয়। বাইরে গেলে সেটাও যাবে।

চন্দ্রিমা থামবার নয় সে জানিয়ে দেয়- তবে তুমি তোমার বাবাকে নিয়ে থাকো। আমি আমার বাবার কাছে যাচ্ছি। ওখান থেকে বুবুনকে স্কুল করাবো।

রঞ্জন কিছু একটা চিন্তা করতে করতে চন্দ্রিমাকে বলে - দেখি বাবাকে একবার বলে দেখি।

চন্দ্রিমা বাধা দেয় - আর দরকার নেই। তোমার বাবার শয়তানের জেদ। গাড়ির জন্য টাকা দেবে না।

রঞ্জন এখানেই থেমে যায়।

পরের দিন থেকে পিনাকেশের সঙ্গে পরিবারের আর সকলের ঠারে ঠোরে একটা সম্বন্ধ চলতে থাকে। চন্দ্রিমা বুবুনকে একরকম আটকে রাখে পিনাকেশের কাছ থেকে। রঞ্জন-ও তার বাবার সামনে এখন থেকে অনেক বেশী ব্যস্ততা দেখায়। এভাবেই কয়েক মাস কেটে যায়। পিনাকেশ বুঝতে পারে গাড়ীর জন্য টাকা দিলে এ ঝঞ্ঝাট মিটে যেত। কিন্তু তার সিদ্ধান্ত অনড়। সে নির্ধারিত সময়ে আশ্রমের হাতে তার টাকা তুলে দেবার বন্দোবস্ত করে বসে।

তিন

দেখতে দেখতে গ্রীষ্মকাল। আগুন ঝরছে শহর জুড়ে। এমন এক দুপুরে শহরের মানুষ যখন এক কোমর গরম ঠেলে নিজের তালে ছোটাছুটিতে ব্যস্ত, পিনাকেশ নিজের কিছু জিনিষপত্র গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়তে প্রস্তুত। আজ রোববার। সকলেই বাড়িই ছিল। পিনাকেশ ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রয়িং রুমে সেখানে রঞ্জন তার ছেলে, বউকে নিয়ে টিভি দেখছে সেখানেই এলো। সে রঞ্জনকে বলল - আমি সপ্তাদুয়েকের আশ্রমের কাজে পুরুলিয়া যাচ্ছি। আমি গেলে ওদের স্কুল বিল্ডিংটার কাজ শুরু হবে।

রঞ্জন বিশেষ কিছু বলে না - ঠিক আছে। শুধু এইটুকু বলে সে তার কথা শেষ করে নেয়।

পিনাকেশ এবার চন্দ্রিমাকে বলে - আসি বউমা।

সে নাতিকে বলে - আসি দাদুভাই। দুষ্টুমি করবে না।

বুবুন ঘাড় নেড়ে তার শুভযাত্রা কামনা করে।

দিন পনের পর পিনাকেশ পুরুলিয়া থেকে ফিরে আসে। সে দিন-ই রাতে রঞ্জন পিনাকেশের ঘরে এলো। পিনাকেশ ফাইল খুলে কিছু একটা দেখছিল। রঞ্জন পিছন থেকে ডাকল - বাবা।

- কে, রঞ্জন, কিছু বলবি? পিনাকেশ জিজ্ঞাসা করে।

- সামনে রোববার আমরা অন্য জায়গায় উঠে যাচ্ছি।

পিনাকেশের মাথাটা কেমন ঘুরে গেল। হাতের কাগজগুলো হটাৎ ছড়িয়ে ছিটিয়ে মাটিতে পড়ে যায়। সে বলে ওঠে - যাচ্ছিস মানে ?

- হ্যাঁ ওখানে গেলে আমাদের কাজকর্ম সুবিধা হবে।

পিনাকেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে - সেটা কোথায়?

- লেকটাউনের ওই দিকটায়। তাছাড়া তোমার বউমা আর এখানে থাকতে চাইছে না। পিনাকেশ এবার বিষয়টা পুরোপুরি বুঝতে পারে। সে বুঝতে পারে এই পনেরো দিনের মধ্যে বাড়ি বদলের সিদ্ধান্ত। সে বিষন্ন ভাবে বলে - যেটায় তোদের সুখ সেটাই কর। আমি আর কি বলব। কিন্তু এখানে তোদের অসুবিধা কোথায় ?

- আসলে তুমি বউমাকে টাকাটা দিলে না......

পিনাকেশ আর কিছু বলে না, নিচু হয়ে মেঝের ছড়ানো নথিগুলো তুলতে থাকে। নিজের কাজে মন দেয়। রঞ্জন-ও ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

বিপত্মীক পিনাকেশের জগৎ-টায় একটা দুর্ভাবনা যোগ হলেও সে নিজেকে সংজত রাখে। ইতিমধ্যে সে একটা বিবেচ্য পথ খোঁজে। বিচ্ছেদটা পুরোপুরি হওয়া দরকার। হাতে মাত্র সাত দিনের সময়।

সময় সামনে চলে বলেই রঞ্জনদের ঘর বদলের রোববারটা পিনাকেশের সংসারে এসে হাজির হল। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের প্যাকিং আর লাগেজ তৈরি। কয়েকজন তদরকী আর মুটে, বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়ানো। এগুলো নিয়েই বিদায় হবে। এদিন পিনাকেশ আর মর্নিং ওয়াকে যায়নি। নিজের ঘরে বসে স্ত্রীর পুরানো ছবিটার ধুলো ঝাড়ছিল। রঞ্জন বাবাকে বলতে আসে, ইতস্তত করে বলে- আমরা যাচ্ছি।

পিনাকেশ কোনো উত্তর না করে রঞ্জনের পিছন পিছন ড্রয়িং রুমে যেখানে বউমা আর নাতি দাঁড়িয়ে, সেখানে এলো। তার হাতে ফোল্ড করা কাগজ। এ মুহূর্তে নিজের অহং নিয়ে প্রত্যেকে এক-একটা চলমান গ্রহশক্তি। অথচ সবাই শব্দহীন, সবাই বোবা। এ শব্দহীনতা ভেঙে হাতের কাগজটা খুলতে খুলতে পিনাকেশ দৃঢ় গলায় বলে ওঠে,- রঞ্জন, যাচ্ছ যখন এটাতে একটা সই করে যাও।

- এটাকি? রঞ্জন জানতে চাইল।

- এটাতে তোমাকে ত্যাজ্যপুত্র করার কথা আছে। কোর্টের কাগজ। ছাড়াছাড়িটা পুরোপুরি হওয়াই ভাল।

রঞ্জন ঢোক গিলতে গিলতে পাশে সোফার ওপর বসে পড়ে। চন্দ্রিমাও সোফার এক কোণে বসে হাত দুটোর মধ্যে মাথা গুঁজে দেয়। বুবুন ছুটে এসে পিনাকেশের হাতের কাগজটা ধরে বলল- দাদু, আমি সই করবো?

বুবুন চন্দ্রিমার পাশে দাঁড়িয়ে দাদুর কথা শুনছিল। তাছাড়া সে দাদুর অনেক কথায় ঢুকে পড়ে। এ অবস্থায় পিনাকেশ ডান হাত নাতির মাথায় রেখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দ্যাখে বাড়ির পিকচার উইনডো থেকে বিকালের আলো তির্যকভাবে তার বৃদ্ধ শরীরটায় এসে পড়েছে। সে নিজেকে ভাল করে একবার দ্যাখে, সে দ্যাখে সে এখন অনেক বেশী আলোকিত।

ওদিকে গাড়ী তৈরি। একজন মুটে আওয়াজ দিল- বাবু সবকুছ তৈয়ার।

বাবু উত্তর করে না। সে হাঁ করে খোলা দরজা থেকে বাইরে তাকিয়ে থাকে।

মন্তব্য (1)add comment

স্বপন ভৌমিক said:

 
সত্যিই যদি প্রত্যেক পাড়ায় অন্তত একটা করে পিনাকেশ দেখা যেত তবে আমার মনে হয় পরিবারের আয়তন ক্ষুদ্রতর থেকে ক্ষুদ্রতম হতে একটু সময় লাগত।
যাইহোক, দারুন লেগেছে আমার।
নভেম্বর 17, 2009

মন্তব্য করুন
quote
bold
italicize
underline
strike
url
image
quote
quote
smile
wink
laugh
grin
angry
sad
shocked
cool
tongue
kiss
cry
smaller | bigger

busy
 
< পূর্বে   পরে >

দূর্গাপুজা

অনলাইনে কে

এই মুহূর্তে আমাদের সাথে 15 জন অতিথি অনলাইন আছেন।