


গেরস্থালি
রান্নাবান্না
গণিতের রূপ ও গণিত শিল্পী | গণিতের রূপ ও গণিত শিল্পী |
|
মিহির চক্রবর্তী লাইবনিৎস বলেছিলেন যে কোন সমস্যা নিয়ে আসুন না, গণনা করে দেখি। লক্ষ করুন, ভেবে দেখি নয়, কল্পনা করে দেখি নয়, মত বিনিময় করে দেখি নয়-গণনা করে শুধু। এমনই গভীর এক দর্শনের দিকে ঝুঁকেছিলেন মধ্যযুগের ইউরোপীয় মনীষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ত্ব যাঁর হাতে ক্যালকুলাসের গোড়া পত্তন হয় নিউটনের সঙ্গে সমান্তরালভাবে, যাঁর হাতে এক অর্থে ভিত্তি স্থাপিত বর্তমান সময়ের অত্যন্ত আকর্ষনীয় ও কার্যকরী ফর্মাল ভাষা ও সিস্টেম তত্ত্ব। গণনা বলতে সাধারণ গণিতের যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ অথবা আরো একটু জটিল কিছু তিনি বোঝাতে চাননি শুধুই। তিনি এক মহাগণিতের কথা ভাবছিলেন। এ মহাগণিতের চিহ্নগুলি হবে মানুষের চিন্তার সাধারণ বর্ণমালা। তিনি ভাবছিলেন এই সিদ্ধান্তগুলি নিয়ে গণনার কথা, সমস্যাকে চিহ্নসমবায়ে রূপান্তরিত করে চিহ্নগুলি নিয়ে নিয়মানুগ অনুশীলনের কথা।গণিত মানেই তো সাধারণত বোঝা হয় গণনা- এই কষাকষি করতে করতেই আমরা বেড়ে উঠতে থাকি এবং সরেও যেতে থাকি তার মর্মবস্ত থেকে। কেউ কেউ পারদর্শী হয়ে ওঠে, 'ব্যাপারটাকে' ধরে ফেলে। গণিত পারা বা না পারার জায়গায় চলে যায়, ভালো লাগা না লাগার জায়গায় আর থাকে না। ঐ ভালো লাগা না লাগার পরিসরটিতে থেকেছেন শীত ও সভ্যতা সহ্য করতে অক্ষম রামানুজম অথবা ফিলডস মেডেল প্রত্যাখ্যানকারী গ্রিগারি পেরেলম্যান অথবা জর্জ ক্যান্টরের মতো গণিত-প্রেমিক ভাবুকজন। সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছেন এঁরাও কিন্তু তা ভালবাসে। সমস্যার সমাধান, যা শেষ বিচারে একটি গাণিতিক প্রশ্নের উত্তর, হ্যাঁ অথবা না। এবং এই উত্তর পাওয়ার জন্য একটি 'প্রমাণে'র সন্ধান-ঐ পারা না পারা। পামান্যতার বেদীর সামনে একজন গণিত-শিল্পী যেন এক দুর্দান্ত ট্রাইবাল, নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকেন। 'গণিত-শিল্পী' কথাটি আমার খুবই যথার্থ মনে হয়। এ শিল্পী নিজের অনুসন্ধানের বস্তসামগ্রী নিজেই তৈরি করে নেন। ক্যন্টর যেমন চাইলেন অসীমতা নিয়ে আঁক কষতে। সকল সীমায়িত সংখ্যাগুলি অর্থাৎ ১,২,৩,৪,... ইত্যাদি ছাড়িয়ে প্রথম অসীমতা, একটি চিহ্ন দিতে হয় তাকে, একটি নাম, ধরা যাক w, তারপর w+১, w+২, w+৩, চলতে চলতে একটি পর্যায়ে একটু মানসিক উল্লম্ফণ, সৃজিত হল w+w অথবা ২w-আবার ২w+১, ২w+২, ২w+৩,... ইত্যাদি এবং এভাবেই গাণিতিক শিল্প-ফসল সৃষ্টি করতে করতে তা নিয়ে খেলতে খেলতে চলা। ক্যান্টর পূর্ববর্তী গণিতজ্ঞরা ঐ অসীমতার সংখ্যাটি 'দেখতে' পাননি, ঠিকভাবে বলতে গেলে দেখতে চাননি। ক্যান্টর বলেছেন দৃষ্টিহীনতায় ভুগছিলেন তাঁরা। শুধুই দৃষ্টিহীনতা? তৎকালীন গণিত জগতের ক্ষমতা-কেন্দ্র ক্যান্টরের এই আবেগমথিত গাণিতিক সৃজনকে মেনে নেননি একেবারেই, সমাজপতিরা তাঁর লেখা প্রকাশিত হবে বাধা দিয়েছেন এবং একটি পর্যায়ে চূড়ান্তভাবে মানসিক-বিধবস্ত ক্যান্টরকে এসাইলামে আশ্রিত হতে হয়েছে। অথচ আজকের গণিত ক্যান্টরীয় সেটতত্ত্বের উপরে সম্পূর্ণভাবে দাঁড়িয়ে। আজ আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চলছে। গণিতজগতের বর্তমান সমাজপতিরা ক্যান্টরীয় সেট থিওরীর বাইরে অথবা বিরোধী কোন কিছুকে স্বীকার করতেই অপ্রস্তুত। ইনট্যুইশনিস্টিক সেট থিওরী প্রস্তাবিত হয়েছিল বিগত শতকের গোড়ার দিকে। আর হয়েছিল নন স্ট্যান্ডার্ড এনালিসিস। বিগত কয়েকটি দশক ধরে কত বিচিত্র তত্ত্ব সৃজিত হচ্ছে-ইন্টারনাল সেট থিওরী, ফাজি সেট তত্ত্ব, রাফ সেট তত্ত্ব, ইনকনসিসটেন্ট এরিথমেটিক, টপস থিওরী এবং এমনি আরো। এই আইডল উৎপাদনের যুগে সেই অর্থে গণিতের সামনে কোন আইডল নেই। প্রকৃতপক্ষে গণিত এখন বহুধাবিভক্ত, এমনকি শুধু বহুই নয়, কখনো কখনো পরস্পরবিরোধীও। ক্যান্টরীয় সেটতত্ত্বে যে মূলবাক্যগুলিকে যাত্রাশুরুর মান্যতা বলে ধরা হয় অন্য সেটতত্ত্বে তার বিরোধী কোন কোন মূলবাক্যকে গ্রহণ করা হয়ে থাকে, যেমন এক্সিয়ম অব চয়েস অথবা কনটিন্যুয়াম হাইপথেসিস। ঠিকএমনটি হয়েছিল অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতির সৃষ্টিতে। অথচ ক্ষমতা কেন্দ্রগুলি পরিচালিত মূল স্রোত এই বিবিধ ভিন্নতাকে পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্তিতেই বাধা দেয়। সেটতত্ত্বের বিভিন্নতার দুয়ার খুলে দিয়েছেন যাঁরা তাঁদের মধ্যে দু'টি প্রধান নাম কুর্ট গ্যেডেল ও পল কোহেন। কোহেন জীবন শেষ করলেন এই গত বছর, তার আগের বছরই ছিল গ্যেডেলের জন্মশতবর্ষ। গ্যেডেলের আর একটি তত্ত্ব বিশ্ববন্দিত- তা হল অসম্পুর্ণতা তত্ত্ব। এই তত্ত্বের অন্যতম ফলশ্রুতি হল, সংখ্যা তত্ত্ব অসম্পুর্ণ। অসম্পুর্ণ এই অর্থে যে যেভাবেই তত্ত্বটিকে সাজিয়ে নেয়া হোক না কেন এমন একটি বাক্য লেখা সম্ভব যেটি প্রমাণিত অথবা অ-প্রমাণিত কোনটিই করা যাবে না। এই তত্ত্ব ডেভিড হিলবার্টের একটি ঘোষিত স্বপ্নকে চুরমার করে দেয়। হিলবার্ট বলেছিলেন, গণিতকে কতগুলি মূল বাক্যের উপর প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব যার ফলে যে কোন গাণিতিক বাক্যকে প্রমাণিত অথবা অ-প্রমাণিত করা যাবে। এটা ১৯০০ খৃষ্টাব্দের গোড়ার দিক, গণিত জগতের ঝোড়ো দিনগুলি বইছে। রাসেল হোয়াটহেড চাইছেন গণিতকে সম্পুর্ণভাবে লজিকে পরিণত করতে, ইনট্যুইশনিস্ট ব্রাউয়ার বলছেন ক্লাসিকাল লজিকে কিছু সুত্র যেমন ল' অব এক্সক্লুডেড মিডল গণিতে প্রযোজ্যই হতে পারে না সাধারণভাবে, আর হিলবার্ট-এর ফর্মালিস্ট স্কুল বলছে গণিত শেষ পর্যন্ত কয়েকটি চিহ্নসমবায়ের খেলাধুলা। তাঁর (হিলবার্টের) ভাবনায় স্পষ্টতঃই লাইবনিৎসের ছায়া। মূলত হিলবার্টই এখনকার মুখ্য স্রোত কিন্ত তাঁর মূল দর্শন অর্থাৎ গণিত হল চিহ্নের খেলা তার প্রতি খুব একটা দরদ আছে বলে মনে হয় না। আমার মতে চিহ্ন ছাড়া গণিত সম্ভব নয় এবং চিহ্ন 'ব্যক্তিহারা অস্তিত্ব' নয় শুধু। যেমন একটি শিলাখণ্ড ফুল পাতা সিঁদুর দুধ ঘন্টা কাঁসর এর মধ্যে দিয়ে এক সময় একটি জনগোষ্ঠীর কাছে অর্থ পায়, গণিত চিহ্নগুলিও সৃজিত হওয়ার পর থেকে নানা গাণিতিক প্রতিক্রিয়া ও প্রশ্নাবলীর মধ্য দিয়ে যেতে যেতে চারপাশে অর্থ-ভর সংগ্রহ করে, এক সময় উক্ত জনগোষ্ঠীর কাছে অর্থের স্থিরতা আসে। বিজ্ঞানের আর কোন বিভাগে চিহ্নের এতো গুরুত্ব আছে বলে মনে হয় না। ব্যবহারযোগ্যতা গণিতের কোন মূল ধর্ম নয়। এ খানিকটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মতো। অনেক সময়েই ব্যবহারের প্রচেষ্টা থেকেই আশ্চর্য সুন্দর গাণিতিক তত্ত্ব বেরিয়ে আসে। তবু মনে রাখতে হবে মোট গণিতের সামান্য অংশই ব্যবহারযোগ্য। সত্য আবিষ্কারের দাবীও তার কাছে করা আর সঙ্গত নয়। বিজ্ঞাপন-বাজার-ব্যবসা-ব্যবহারিকতার বাইরে শুধুমাত্র সৌন্দর্যের একান্ত কোনটিই তার নিজস্ব। এই অর্থে গণিত অনেক কাছাকাছি শিল্পের অথবা কবিতার। সুন্দরের যদি কোন সত্য থাকে তাহলে সে সত্য গণিতেরও। সে কথা বারান্তরে। Set as favorite Bookmark Email This Hits: 501 মন্তব্য (3)
![]()
সিদ্ধার্থ গুপ্ত
said:
|
|||||
| ভীষণ ভালো লাগলো। মিহিরবাবুর কাছে আ-------র-------ও এই ধরণের মনন ঋদ্ধ করা গণিত বিষয়ক রচনা পাঠের আশায় রইলাম। |
| অসাধারন । অঙ্ক নিয়ে এরকম সুন্দর লেখা আগে চোখে পড়েনি । মিহিরবাবুর আরও লেখা আশা করছি ভবিস্যতে । |
| < পূর্বে | পরে > |
|---|