|
জল-ডাঙার দিগন্তরেখায় আকাশ জলরাশির বিপুল উচ্ছাস নমিতা চৌধুরি
ধানক্ষেত পেরিয়ে মাঠ, মাঠ পেরিয়ে নদী আর নদীর ঢেউগুলির সঙ্গে মিশে আছে আকাশের রঙ। শিল্পীকর্মগুলিও যেন এমন, উলকাঁটায় বুনতে বুনতে নানাভাবে নক্সা তুলতে তুলতে মিলেমিশে একাকার। চলচ্চিত্র, সাহিত্য, চারু ও কারু শিল্প, সঙ্গীত, নৃত্য, ভাস্কর্য এর কোনটিরই উপরিতলের ভাষা একভাবে চলে না। গঠনগত বৈশিষ্ট্য আলাদা হলেও, মাধ্যম আলাদা হলেও শিল্পভাষাগুলির অন্তস্থলে রয়েছে এক গভীর সংযোগ। বস্তুত শিল্পভাষার অন্তর্গঠনে ছড়িয়ে আছে যে চিহ্নগুলি সেইগুলি থেকেই উৎসারিত হয় শিল্পকর্মের বিভিন্ন স্রোতধারার। তাই ছবির মধ্যে আমরা খুঁজে পাই, কবিতার রূপ, কবিতার মধ্যে মূর্ত হয়ে ওঠে চিত্রকথা, সঙ্গীতের সুর। মন্দির ভাস্কর্য থেকে কবি শিল্পী খুঁজে নেন তাঁর শিল্পের উপাদান। আর চলচ্চিত্র শিল্প তো একই সঙ্গে ছবি-কবিতা-গান-নাটক নিয়ে কাজ করে চলেছে।
শিল্প কর্মের কাঠামো সব সময়ে স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ হয়না বরং অনিয়মিতভাবে বিন্যস্ত বিভিন্ন এককের সুক্ষ্ম ভারসাম্যে তা রচিত হতে পারে।
সৌন্দর্যের বিমূর্ত ধারণা শৈল্পিক ক্রিয়াকর্মের একেবারে প্রাথমিক ভিত্তি।
প্রথম আমরা ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে বাইরের গুণাগুণকে উপলব্ধি করি- যেমন রঙ, ধবনি, আচরণভঙ্গি এবং আরও জটিল ও অসংজ্ঞাত সব শরীরী সংবেদনকে বোধের মধ্যে গ্রহণ করি।
দ্বীতীয়তঃ আনন্দদায়ক আকার ও রূপে এই ইন্দ্রিয়জাত বোধ বা উপলব্ধির perception বিন্যাস ঘটাই।
তৃতীয়ত এই দুটি কাজ শেষ হলে পরের পর্যায়ে আবেগ বা অনুভূতির পূর্বগঠিত স্তরের সঙ্গে উপলব্ধির নতুন বিন্যাসকে মেলাতে চেষ্টা করি এবং তার ফলেই ঘটে অনুভূতির অভিব্যক্তি বা expression. বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের কথায়, 'আকার ভঙ্গী, উদ্দীপনা, ধ্যানধারণা- এইগুলিকে বলা যায় শিল্পের অন্তরেরবস্তু, আঙ্গিকের সাহায্যে নির্মিত হয় আধার এবং উদ্দীপনা ধ্যানধারণা এইগুলিকে বলা যেতে পারে আধার ও আধেয় উভয়ের অখণ্ড সংযোগে প্রকাশিত হয় রসসৌন্দর্য।'
অবনীন্দ্রনাথ বলেছেন, 'রসের মধ্যে তিনটি জিনিস- একটি তার আকার প্রকার একটি তার অন্তর্নিহিত ভাব আর দুটি জড়িয়ে যে মাধুরি ফুটল সে-টি।
নীরদ মজুমদার চিত্রকলায় কবিতার গ্রন্থনা প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন- 'একটা স্থির বিন্দুকে ঘিরে জ্যামিতিকভাবে অবস্থা থেকে অবস্থানান্তরে পরিবর্তিত হয়েই গড়ে ওঠে আর্কিটাইপাল চিত্রকথা। এ হচ্ছে মৌল প্রতীকঃ আদি প্রতিমা, এখানেই তিনি দাবী করেন দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় অর্থের ক্রমবিন্যাস। কবিতায় এই স্থির বিন্দুই তো এলিয়ট কথিত 'still point of the turning world.'
জার্মান শিল্প ঐতিহাসিক ল্যামপ্রেশট আদি কেল্টিক যুগের অলঙ্কার শৈলীর প্রকৃতরূপের একটি অসম্ভব সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন। এই বর্ণনাটির সঙ্গে যেন মিশে যায় শিল্প ভাষার অন্তর্গঠন ও অন্তর্বয়নের বিষয়টি। এই অলঙ্কার শৈলীর একটি নির্দিষ্ট সরলরূপ আছে, যার অন্তর্বয়ন ও সংমিশ্রণ এই অলঙ্কারের চরিত্র-নির্ধারণ করত। প্রথমে ছিল শুধু বিন্দু, রেখা আর ফিতে, পরে বক্ররেখা, বৃত্ত, উর্ধবমুখি ঘোরানো রেখা, সর্পিল আঁকাবাঁকা রেখা, s-এর মত একটা নকশাও ব্যবহৃত হত। যদিও প্রতীকী রূপের এ কোনো বড় নিদর্শন নয় তবুও এর ব্যবহারের ধরনে এক বিচিত্ররূপ প্রকাশিত হয়েছে। কখনো সব সমান্তরালভাবে পাশাপাশি চলেছে, তারপর পাকিয়ে গেল এবার তির্যক রেখার জাফরি দেখা যাচ্ছে; গিট পাকালো, তারপর বিনুনির সুসমঞ্জস্য চৌখুপির মধ্যে একে একে তাদের গুটিয়ে নেওয়া হল। এইভাবে অকল্পনীয় বহু বিভ্রান্তিকর রূপের বিন্যাস উদ্ভুত হল যার আশ্চর্য ধাঁধা যেন সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে, যার অবিরাম কুণ্ডলী যেন মনে হয় পরস্পরকে একবার খুঁজছে পরমুহূর্তেই চাইছে এড়িয়ে যেতে। যার সংবেদনশীল বিভিন্ন অংশে আবেগঘন প্রাণিত গতিময়তা দৃষ্টি ও অন্যান্য অনুভূতিকে যেন বেঁধে ফেলে আষ্টেপৃষ্ঠে।
কমলকুমার মজুমদার বলেছেন, 'আমাদের দেশের পদ্যকার বা কবিরা আঁকা সম্পর্কে কভার ছাড়া আর মাথা ঘামান না। অন্যপক্ষে শিল্পীরা কভারের নাম ছাড়া আর কিছুই প্রবেশ করেন না'। -এই কথা দ্বিধাহীনভাবে আমরা কখনোই মেনে নিতে পারি না। কারণ আমাদের চারপাশে বহু শিল্পী কবি রয়েছেন যাঁরা নিজেরা একাধারে চিত্রশিল্পী এবং কবি কিংবা শিল্পের অন্য শাখার সঙ্গে যুক্ত। কমলকুমার নিজেই ছিলেন একজন চিত্রশিল্পী, নাট্যকার এবং অনন্যসাধারণ গল্পকার।
রবীন্দ্রনাথের কথা তো আমরা সবাই জানি বিভিন্নধারার সাহিত্য সৃষ্টির পাশাপাশি তিনি দিয়েছেন সঙ্গীতের সুর এঁকেছেন ছবি।
শিল্পের যাবতীয় প্রকার ভেদেই কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকে। তার অনেকটাই উপরিতলার। অন্তস্থলে যে অনুকণাগুলি খেলা করে সেই তো উসকে দেয় কবিকে, ভাস্করকে, চিত্রশিল্পীকে, নৃত্যশিল্পীকে। আর বুনট চলতে থাকে কাশ্মিরী কার্পেটের মত।
রবীন্দ্রনাথ নিজের ছবি আঁকার কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন যে ছন্দই একজন চিত্রশিল্পীর সৃষ্টির 'প্রধান শক্তি'।
সার্ত্র কাব্য এবং চিত্র শিল্পের মধ্যে একটি সেতু রচনা করতে চেয়েছিলেন। তিনি কবিতা এবং ছবিকে একই বন্ধনীভুক্ত করতে চেয়েছিলেন কারণ দুই ভাষাই মূক- প্রতিমার জন্ম দেয়, কোন অর্থ সূচিত করে না।
সিস্টিন চ্যাপেলের আঁকা নিজের ছবির স্মৃতি থেকেই জন্ম নিয়েছিল মাইকেল এঞ্জেলোর সনেটগুচ্ছ।
অবনীন্দ্রনাথের ছবির রঙের প্রশংসা করে রাজা রবিবর্মা বলতেন 'ছবিগুলো ভারি কবিত্ব পূর্ণ'।
রামকিঙ্কর একবার বলেছিলেনঃ 'মিউজিকের সঙ্গে পেটিং-এর কোথায় যেন ভীষণ একটা যোগ আছে গানে, বিশেষত, ক্লাসিকাল, শুনতে শুনতে আমার ভেতর অদ্ভুত একধরণের ছবি ফুটে ওঠে।'
এলিয়টের 'এশ ওয়েনসডে' ছাপা হবার পর স্পেন্ডারের মনে হয়েছিল 'the mysterious second movement of Beethoven's Quartet in A Minor, opous 132'।
বিষ্ণুদের বহু কবিতা, ছবি, গান, ভাস্কর্য থেকে উঠে এসেছে। তাঁর 'অর্কেষ্ট্রা' 'জন্মাষ্টমী' কবিতার সঙ্গে পশ্চিমী সিমফনির যে অন্তঃসম্পর্ক রয়েছে তা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। কখনো পিকাসো, যামিনী রায়ের ছবি, কখনো দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, রাজেশ্বরীদত্ত, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের গান তাঁর কবিতাকে অনুপ্রাণিত করেছে।
শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন; 'পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ'র লেখাগুলির মধ্যে রয়েছে বিষ্ণুপুর শিউড়িতে দেখা টেরাকোটা আর মন্দিরের স্থাপত্যের অভিঘাত এবং কালিংপঙের এক বৌদ্ধ মন্দিরের স্থাপত্যকে তিনি বিন্যস্ত করেছেন 'পদ্মসম্ভব' কবিতাটিতে।
'পটুয়া এবং সময়' লেখাটিতে প্রদ্যুন্ম ভট্টাচার্য বলেছেন, 'শিল্পী যদি দেশজ ঐতিহ্যের জমির উপর দাঁড়িয়ে নতুন চিত্রকলার সিংহদার খুলতে চান, পটুয়াদের ছবি তাঁর হাতে চাবিকাঠির কাজ করবে।... শুধু ছবির রাজ্যেই কেন, শিল্পকলার আরও বহুতর ক্ষেত্রেও নতুন নতুন প্রবর্তনা জোগাতে পারে পটুয়াদের কাজ।
...দীর্ঘপটে পর পর ছবিগুলো খুলে খুলে দেখানো হয় ক্রমশঃ 'এতে থেকে থেকে এক ধরণের গতির দোলা লাগে ছবিতে। ছবি হয়ে ওঠে চলচ্ছবি, আর তার সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে গানের বাহনে চড়া গল্প।'
মায়াকোভস্কির কবিতার নানামাপের ভাঙা ভাঙা প্রবহমান লাইনে সিনেমার ছন্দের প্রতিসাম্য পেয়েছিলেন আইজেনস্টাইন। তিনি চীনাদের বা জাপানীদের চিত্রলিপি থেকেও মন্তাজ-এর উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন।
মন্দির ভাস্কর্য থেকে নাচের ছন্দকে হাতের মুদ্রায় তুলে এনেছিলেন উদয়সঙ্কর।
বতিচেল্লির বিখ্যাত ছবি 'প্রিমাভেরা' থেকে ইসাডোরা ডানকান স্মরণীয় একটি নাচের জন্ম দিয়েছিলেন। রঁদ্যার ভাস্কর্য ছিল তাঁর নাচের অন্যতম উৎস।
শিল্পকর্মগুলি কীভাবে কেন্দ্র থেকে প্রান্তসীমায় পৌঁছে যায়। ওতপ্রোত জড়িয়ে যায়, কখন ছবি কবিতা হয়ে ওঠে। কখন গান হয়ে যায়, কখন সুর কাব্যকে আশ্রয় নিতে চায়, সিনেমা কবিতার মত হয়ে ওঠে তা বুঝতে গেলে শিল্পভাষার অন্তর্বয়নের দিকে দৃষ্টিপাত করতেই হয়; না হলে এই জটিল প্রতিক্রিয়া কিছুতেই অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
বিষয়ের বিশেষীকরণ আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে ক্রমাগত। ক্রমশ আমরা একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আমাদের ডান হাত বাঁ হাতকে চিনতে পারছে না এখন আর। একচক্ষু হরিণের মত আমরা ভুল বশত এগিয়ে চলেছি বাঘের জঙ্গলের দিকে। তবুও এরই মধ্যে ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশ পাথর। আর 'গানের জগৎকে ভাস্কর্যের জগৎকে বা এমনকী চলচ্ছিত্রে জগৎকে যখন দেখতে থাকেন কবি, তার থেকে নানা রকম ইশারা তিনি তুলে নিতে পারেন অবিবরত, তুলে নেনও, তার নিজের সৃষ্টির কাজে।'
দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনটুকু মেটাবার জন্য শুধু স্বাভাবিক স্বর এবং উচ্চারণই যথেষ্ট কিন্তু শিল্পের জন্য নয়। শিল্প জীবনকে উন্মোদিত করে এবং তা প্রকাশিত হবার জন্য চাই উন্মুক্ত বাতায়ন। জীবনের প্রতিটি অণুপরমাণুতে যে সৃষ্টির রহস্য লুকিয়ে আছে। যেগুলি সমকালীনতার আয়তনকে ছাপিয়ে অবিরাম বিভিন্ন গড়নে নিজেকে উদ্ভাসিত করছে সেগুলিকে খুঁজে পেতেই চান, সৃষ্টশীল মানুষজন আর তার ফলেই- যেন একই সূত্রে গাঁথা হয়ে যায় শিল্পকর্মগুলি। এক শিল্প অন্য শিল্পের দিকে অনেক সময়ে চেয়ে থাকে একটা অগমন্যতার সুদূরতার বিষ্ময় নিয়ে। কখনো তাই গান শুনে চিত্রশিল্পীর মনে হয়। 'এত ছবি এঁকেও কি ও সুরের কণামাত্র ছুঁতে পারি আমরা? গান যেখানে পৌঁছে দেয়, তার থেকে কতদূরে পড়ে থাকে আমাদের ছবি কী হবে আর এঁকে!' আর কবির মনে হয়, 'রঙ রেখা যতদূরে নিয়ে যেতে পারে মন, কবিতার শব্দ কি তাকে দিতে পারে তত! কবিতার চেয়ে কত বেশি বলে ছবি।' তারপর কবির কবিতা শুনে সমঝদারেরা বলে ওঠেনঃ 'ছবির মধ্যে সুর বুনতে বুনতে কবিরাই শুধু পারেন জটিল এত অনুভবকে মূর্ত করে তুলতে'!...'এ কোনো চির উচ্চারণ নয়, স্থায়ী সিদ্ধান্ত নয়। এতে কেবল এইটুকু বোঝা যায় যে সব শিল্পই অন্য শিল্পের দিকে তাকিয়ে থাকে আরো মুক্তির ইশারা পাবার জন্য, আরো দূর প্রধাবনের ইশারা'।
|