|
আদ্যনাথ মুখার্জি সাম্যবাদী চেতনা নজরুলকে অসাম্প্রদায়িক করেছিল। যদিও এই অসাম্প্রদায়িকতা তিনি জন্মসূত্রে পেয়েছিলেন। তাঁর পিতা সর্ব ধর্মাবলম্বী লোকের প্রিয় ছিলেন। কুরান, হাদীশ, পুরাণ, গীতা, রামায়ণ, মহাভারতের লোকায়ত ব্যাখ্যাগণ লেটো দলে ভিড়ে গিয়ে পেয়েছিলেন এবং
সেখান থেকেই একটা উদারনৈতিক মানবতাবোধ তিনি অর্জন করেছিলেন। সেজন্য হিন্দু ও মুসলমান উভয় ঐতিহ্য থেকে আহরিত শব্দ, উপমা, রূপক, মিথ বাকভঙ্গি অবলীলাক্রমে আহরণ করে সারাজীবন কবিতা ও গান করেছেন। হিন্দু আদর্শে উদ্দীপ্ত কবিতা 'রক্তাস্বর ধারিনী মা' আগমনী প্রভৃতি মুসলিম আদর্শজাত কবিতা 'সাতইন আরব' খেয়াপারের তরণী মোহরময় প্রভৃতি। আবার উভয় ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে কবিতা 'বিদ্রোহী', 'প্রলয়োল্লাস'। তেমনি সংগীত রচনার ক্ষেত্রে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শ্যামা সংগীত রচয়িতা আবার বাংলা ভাষায় মিলনি গানের প্রবর্তক। বিষয়বস্তু হিন্দু বা মুসলিম যাই হোক না কেন মানবতার উচ্চাদর্শ অনুসরণ করার আহ্বান জানায় তাঁর সৃষ্টি। "আমি হিন্দু-মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। তাই তাদের এ সংসারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানী শব্দ ব্যবহার করি বা হিন্দুদের দেবীর নাম নেই। অবশ্য এরজন্য অনেক জায়গায় আমার কাব্যের সৌন্দর্য হানি হয়েছে। তবু আমি জেনে শুনেই তা করেছি" (ইব্রাহিম খাঁকে লিখিত পত্র)। জাতির অভিমানকে তিনি পরাধীনতার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন। জাতিতে জাতিতে হানাহানির সুযোগ নিয়েই বিদেশীরা আমাদের পদানত করে রেখেছে। একথাই তিনি নানারূপে নানা রসে ব্যাক্ত করে মিলনবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে বলেছেন...... ! ভাই হয়ে ভাই চিনবি আবার গাইব কি আর এমন গান, (সেদিন) দুয়ার ভেঙে আসবে জোয়ার মরা গাঙে ডাকবে বান। (যত) মাদীতোরা বাঁদী বাচ্চা দাস মহলের খাস গোলাম। (হায়) মাকে খুঁজিস? চাকরানী সে, জেলখানাতে ভানছে ধান, (ওরে) তোরা করিস লাঠালাঠি (আর) সিন্দু ডাকাত লুঠছে ধান (তাই) গোরব গাদা মাথায় তোমার কাঁঠাল ভেঙে খায় শেয়ান। (মিলন গানঃ ভাঙার গান) ! শুধু গুন্ডামী ভন্ডামী আর গোঁড়ামী ধর্ম নয়, এই গোঁড়াদের সর্বশাস্ত্রে শয়তানী চেলা কয়। একযে স্রষ্টা সব সৃষ্টির এক সে পরম প্রভু একের অধিক স্রষ্টা কোনো যে ধর্ম কহে না কভু। (গোঁড়ামী ধর্ম নয়ঃ শেখ সওগাত) ! লোভ আর ভোগ চাহে যারা নাই তাদের ধর্ম জাতি তাহাদের শুধু এক নাম আছে রাক্ষস বলে খ্যাতি হউক হিন্দু হোক ক্রীশ্চান হোক সে মুসলমান ক্ষমা নাই তার, যে আনে তাহার ধারায় অকল্যান। (এক আল্লার কৃপা নয়ঃ শেখ সওগাত) ! মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান। মুসলিম যার নয়নমনি হিন্দু তাহার প্রান। এক যে আকাশ মায়ের কোলে সব রবি শশী দলে এক রক্ত বুকের তলে, এক সে নাড়ীর তান। (সুরসাকি) ! মানুষে মানুষে যেখানে প্রানের মিল, আদত সত্যের মিল, সেখানে ধর্মের বৈষম্য কোনো হিংসার দুশমনী ভাব আনে না। ! মন্দিরে গিয়ে পূজা করা, মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়াটাই কি ধর্মের সার সত্য ? এগুলো তো বাইরের বিধি, সব ধর্মের ভিত্তি, চিরন্তন সত্যের পর যে সত্য সৃষ্টির আদিতে ছিল; এখন রয়েছে এবং অনন্তেও থাকবে। অর্থনৈতিক দিক থেকে শুধু শোষন নয়, নৈতিক দিক থেকে, ধর্মের দিক থেকেও মানুষকে প্রতারিত করছে শোষক শ্রেনী। তারকেশ্বরের মোহান্তদের অত্যাচার ও শোষনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন সেদিন শুরু হয়েছিল তার পুরোভাগে নজরুল ছিলেন। 'মোহান্তের মোহ অন্তর গান' -এ ধর্ম ব্যবসায়ীদের মুখোশ খুলে দিয়েছিলেন। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস অথচ তাকেই পুঁজি করে মৌলবাদীরা নিজেদের মতলব হাসিল করে। মন্দির মসজিদ গীর্জার দোহাই দিয়ে শোষন করছে মোল্লা পুরুতরা - ! হায়রে ভজনালায় তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয়। (মানুষঃ সাম্যবাদী) তাই ! কোথা চেঙ্গিস গজনী মামুদ, কোথায় কালা পাহাড়? ভেঙ্গে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা দেওয়া দ্বার। ধর্মান্ধতা শোষন ব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখে। পথে ঘাটে শালু বিছিয়ে মাজার তৈরী করা, মাদ্রাসাতে ধর্মন্ধতার পাঠ দেওয়া, ফুটপাতে, গাছের তলায় যেখানে সেখানে শনি ঠাকুর, কালী ঠাকুর, মনসা ঠাকুর, শিব ঠাকুর, হনুমান মন্দির তৈরী করে পয়সা উপার্জন করা, শোষনেরই নামান্তর। তাছাড়া পরাধীন জাতির কোন ধর্ম থাকতে পারে না। ধর্মাধর্ম পরে, স্বাধীনতাই প্রথম লক্ষ হওয়া উচিৎ । তিনি বলেছেন, 'যার ঘরে বসে কথা কইবার অধিকার নেই, অত্যাচারকে চোখ রাঙ্গাবার যার শক্তি নেই তার আবার ধর্ম কি? ওরে ভন্ড তোর আবার ধর্ম কি ? যারা তোকে ধর্ম শিখিয়েছে, তারা শত্রু এলে বেদ নিয়ে পড়ে থাকতো? তারা আগে বাঁচতো।" (আবার ধর্ম) তাই তাঁর কাছে আগে স্বাধিনতা, আগে বাঁচার প্রশ্ন, তারপর ধর্ম। কখনও তিনি ধর্মকে শক্তি ও প্রেরনার উৎস মরে করেন, কখনও তিনি মানুষের দুঃখ দুর্দশার কারন বলে করেন। এই দুয়ের মধ্যে বিরোধ নেই, শুধু ধর্মের নামে ভন্ডামী ও ধর্মকে মূলধন করে দাঙ্গা লাগিয়ে যারা ফায়দা লুঠতে চায় তাদের বিরুদ্ধেই তিনি জেহাদ ঘোষনা করেন; তাদের মুখোশ ছিঁড়ে দিয়েছেন কারণ তাঁর কাছে সাম্প্রদায়িকতার বীভৎস নরমেধ যজ্ঞের নীরব দর্শক হয়ে থাকা নৈতিক অপরাধ বলে মনে হয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মের দিক দিয়ে নানা জায়গায় নানা ভাবে অপদস্থ হয়েছেন-তাঁর স্ব-সমাজ তাঁকে কুলাঙ্গার নরাধাম শয়তান মরদুদ এমনকি কাফের বলেছে আর হিন্দু সমাজ জন্মত মুসলমান বলে তাকে ঘৃণা করেছে। এক পংক্তিতে বসে আহার পর্যন্ত করেনি। তিনি সখেদে বলেছেন, "আমায় মুসলমান সমাজ কাফের খেতাবের সে শিরোপা দিয়েছে তা আমি মাথা পেতে গ্রহণ করেছে"। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন "ইসলামের নামে যে কুসংস্কার মিথ্যা আবর্জনা স্তপীকৃত হয়ে উঠেছে তাকে ইসলাম বলে না মানা কি ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযান"। (ইব্রাহিম খাঁকে পত্র) এই আবেষ্টনীর মধ্যে সারাজীবন অতিবাহিত করেও নিজের অসাম্প্রিদায়িক ব্যক্তিত্ব বজায় রেখেছেন। তাঁর এই অসাম্প্রিদায়িক ব্যক্তিত্ব কি হিন্দু কি মুসলমান কেউই গ্রহণ করেনি। তিনি নিজের ধর্মবেদনা ইব্রাহিম খাঁকে ব্যক্ত করেছেন-"আজিকার সাম্প্রদায়িক মাতলামির দিনে আমি যে মুসলমান এইটাই হয়ে পড়েছে অনেক হিন্দুর কাছে অপরাধ আমি যত বেশী অসাম্প্রদায়িক হইনা কেন।" সাহিত্যকেই সামাজিক চেতনার হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করতে হবে এ কথা জানতেন বলেই দেশ ও জাতির মঙ্গলের জন্য সামাজিক দায়িত্ব রূপে তিনি তাঁর লেখনীতে ব্যবহার করেছেন। জাত বিচারকে লক্ষ্য করেই তিনি 'জাতের বজ্জাতি' গান লিখেছিলেন -- ! হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি, ভাবলি এতেই জাতির জল তাইত বেকুব, করলি তরা এক জাতীতে এক-শ-খানা। (বিষের বাঁশী) এর ফলে-- ! (এই) আচার বিচার বড় করে প্রান দেবতার ক্ষুদ্র ভাবা (বারা) এই পাপেই আজ উঠতে বসতে সঙ্গী মামার খাচ্ছে থাবা (ঐ)। জাতীভেদের বিভৎসতা সাম্প্রদায়িক হানাহানির কুৎসিত রুপ দেখেছিলেন। দেশ জাতীকে ভালবাসতেন বলেই জাতীর দোষ ত্রুতি চখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। জাতী দাঙ্গা হানাহানি বন্ধ করাই তাঁর ব্রত ছিল। কয়েকটি চিঠিতে ও ভাষনে তিনি তাঁর সাহিত্য কর্মের প্রধান লক্ষের কথা ব্যক্ত করেছেন। যেমন-- ! আপনারা বিশ্বাস করুন, আমি নেতা হতে আসিনি, কবি হতে আসিনি, আমি এসেছিলেম হিন্দু ও মুসলমানের সঙ্গে শেকহ্যন্ড করিয়ে দেবার জন্য। (অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁকে লিখিত পত্রে) ! হিন্দু হিন্দু থাক, মুসলমান মুসলমান থাক, শুধু একবার এই মহাগগনতলের সীমা হারা মুক্তির মাঝে দাঁড়াইয়া মানব। তোমার কন্ঠে সেই সৃষ্টিএ আদিমবানী ফুটাও দেখি। বল দেখি "আমার মানুষ ধর্ম"। দেখিবে দশদিকে সার্বভৌমিক সাড়ার আকুল স্পন্দন কাঁপিয়া উঠিতেছে। -- মানবতার এই মহান যুগে একবার গন্ডী কাটিয়া বাহির হইয়া আসিয়া বল যে, তুমি ব্রাহ্মন নও, শুদ্র নও, হিন্দু নও, মুসলমানও নও, তুমি মানুষ - তুমি ধ্রুব সত্য। ( ছুৎমার্গঃ যুগের বানী) ! হিন্দু মুসলমানে দিন রাত হানাহানি, জাতিতে জাতিতে যুদ্ধ বিগ্রহ, মানুষের জীবনে একদিকে কঠোর দারিদ্র, ঋণ, অভাব - অন্যদিকে লোভী আসুরের যক্ষের ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা পাষান স্তুপের মত জমা হয়ে আছে - এই অসম্য, এই ভেদ ঞ্জান দূর করতেই এসেছিলাম। আমার কাব্যে, সঙ্গিতে, কর্মে জীবনে অভেদ সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম - অসুন্দরকে ক্ষমা করতে অসুরকে সঙ্ঘার করতে এসেছিলাম। (যদি আর বাঁশী না বাজে) তাই তিনি হিন্দুর কবি নন, মুসলমানের কবি নন, তিনি ছিলেন মানবতার প্রতিভু নজরুল হিন্দু-লমান। তার সাহিত্য ছিল হিন্দু-লমানের জন্যই উৎসর্গীত।
|