• Increase font size
  • Decrease font size
  • Default font size
Kolkata in pictures
 Bangla font help

বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল
পুন্য হউক, পুন্য হউক, পুন্য হউক হে ভগবান।
বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাটি
পুন্য হউক, পুন্য হউক, পুন্য হউক হে ভগবান।
বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা
সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক হে ভগবান।
বাঙালির প্রান, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন
এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান ।

                                                                 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 
প্রচ্ছদ arrow সাময়িকী arrow প্রবন্ধ - Bangla short stories arrow বাংলার লুপ্তপ্রায় সুচিশিল্প
বাংলার লুপ্তপ্রায় সুচিশিল্প

শ্রী প্রভাত সেন

গ্রাম বাংলার আনাচে কানাচে কত রকম শিল্প সম্পদ লুকিয়ে আছে তার খোঁজ আমরা খুব একটা রাখিনা। অন্যান্য জায়গার শিল্প-কলা নিয়ে আমরা আলোচনায় মুখর হয়ে উ ি। বাংলার গ্রামের শিল্প কলার কথা মনে হলেই রবীন্দ্রনাথের এই কথাগুলি মনে হয় - "দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দুইপা ফেলিয়া, একটি ধানের শিষের উপর একটি শিশির বিন্দু"।

আমাদের অবহেলা আর অবঞ্জায় আজ বাংলার পল্লীগ্রামের নানান শিল্প কর্ম লুপ্তপ্রায়। এমনি একটি সুচিশিল্প। এক সময় বাংলার ঘরে ঘরে সুচিশিল্পের জিনিষপত্র ব্যবহার হত, সুচি কর্মের মুন্সিয়ানার উপরেই পাত্রপক্ষের লকেরা পাত্রী নির্বাচন করতেন। সুতো দিয়ে কাপড়ের উপর ছবি আঁকা, কাঁথা সেলাই, রুমাল, শিকা তৈয়ার, বিছানার যাবতীয় জিনিষপত্র, ছোট ছেলেমেয়েদের জামাকাপড় সবই করতেন। বিয়ের পর নতুন বৌরা সন্ধ্যার পর বাড়ির ছোট ননদকে খাটের পাশে বসিয়ে গল্প করতে করতে; লাম্পের আলোতে ঐ সব নিপুন শিল্পকর্ম সৃষ্টি করতেন। অল্প আলোতে কাজ করতে করতে মাঝে মাঝেই কাঁধের আঁচল টেনে চোখের জল মুছে আবার কাজ শুরু করতেন। এই নিষ্ ার কাজগুলি ছিল এক একটি সুন্দর শিল্প সৃষ্টি। এতে লতা পাতা ফুল, ফল, প্রজাপতি, পাখী, হাতি, ঘড়া সব রকম জীব জন্তুর ছবিই নানা রঙের সুতো দিয়ে ফুটিয়ে তুলতেন। এর মধ্যে কুশকাটির জিনিষপত্র তৈরীর পদ্ধতিটি খুব সুন্দর। বাঁ হাতের একটি আঙ্গুলে নতুন সুতো ব্যান্ডিজের মত জড়িয়ে নিয়ে ডান হাতে কুশ কাটিটি নিয়ে আঙ্কোলের সুতোর সাথে পোঁছ দিয়ে দু'হাতের কবজি নাচাতে নাচাতে ম্যাজিকের মত প্রয়োজনীয় শিল্প সৃষ্টি করতেন। কয়েক বছর আগেও ট্রামে, বাসে, ট্রেনে দেখা যেত মহিলাদের হাতে উলের কাটি ও ভান্ডিল, এখন সেখানে এসেগেছে মোবাইল। কুশ কাটি ও উলের কাটির জামা-কাপড় আজ আর দেখা যায় না। আজ সবাই যান্ত্রিক হয়ে গেছে। যে কাজ শিল্পীরা করত তা আজ সাধারন কলের শ্রমিকরা তৈয়ার করছেন। এক দেয় সত্যিকার শিল্প অন্যটি দেয় মিথ্যাকার শিল্পের নমুনা। একটা হাতে বোনা গেঞ্জী এবং অন্যটা কলে বোনা গেঞ্জী। একটাতে প্রবৃতি নিয়ে কাজ হল, অন্যটাতে শ্রমিকের পরিশ্রমে কাজ হল। দুইটি কাজ এক সাথে দেখলে মনে হয় একটি আসল অন্যটি নকল। কলের বোনাতায় যেন কোথাও একটা ফাঁকি থেকে যায়। মনে হয় হাতের বোনাটায় প্রাণ আছে অন্যটায় তা নেই।

 

বাংলার কাঁথা শিল্পও আজ শেষ হওয়ার পথে, কাঁথা শিল্পও আজ যান্ত্রিক রুপ নিয়েছে। এক সময় বাংলার কাঁথা শিল্প একটা গ্রামিন শিল্প হিসাবে পরিচিত ছিল। তখন ঘরে ঘরে নকশি কাঁথার প্রবনতা ও প্রতিযোগিতা ছিল; কে কার চেয়ে কত সুন্দর নকসীকাঁথা বানাতে পারেন। নকসী কাঁথা তৈয়ারীর পদ্ধতি খুবই সুন্দর ছিল, তবে সহজ ছিল না। সেই কাঁথা তৈয়ার হত পুরানো কাপড়ের উপর পুরানো কাপড়ের সুতো দিয়ে। এখানে একটা প্রশ্ন উ তে পারে নুতন সুতায় কেন হবেনা। তার একটা বৈঞ্জানিক ব্যাখা(যুক্তি) আছে, পুরাতন কাপড়ের উপর নুতন সুতায় কাজ করতে গেলে পুরানো কাপড়ের জমি কেটে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। তাই মহিলাদের পুরানো শাড়ী, কাপড়ের পাড়, মুল কাপড় থেকে আলাদা করে নিয়ে বিভিন্ন রঙের সুতো উ াতেন। পাড়ের থেকে সুতো উ ানোর পদ্ধতি ছিল খুব সুন্দর, পাড়টির এক দিকে এক পায়ের দু'আঙ্গুলে চেপে ধরে বাঁ হাতে টেনে নিয়ে পাড়ের ছেড়ার দিক থেকে সতো টেনে ডানহাতের চার আঙ্গুলের মধ্যে রিং মত গোলকরে গুটিয়ে নিয়ে পরপর সুন্দর ভাবে বাঁশের অথবা কা ের চালায় সাজিয়ে নিতেন একটি রংকে। সাধারন কাঁথার চেয়ে নকসী কাঁথায় অনেক বেশী যত্ন ও শ্রম দিতে হত। বেশীর ভাগ নকসীকাঁথাই সাদা ধুতি বা সাদা কাপড়ের উপর নানা রঙের সতো দিয়ে সেলাই করা হত। কাঁথাটি নির্দিস্থ পাশ ও লম্বা মাপ িক করে। কাঁথার জমির চার দিকের বর্ডারকে নিচের পাটির সাথে সুতো দিয়ে টান টান করে তার চারপাশের লতা, পাতা ও ফুল দিয়ে সুন্দর ভাবে আলপনার বর্ডার তৈয়ার করতেন। এরপর শিল্পীর ইচ্ছামত ভিতরের জমিটিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে, তার ভিতর হাতি, ঘড়া, পাখী, প্রজাপতি ও নানান জীবজন্তুর ছবি এঁকে নিতেন, কেউ কেউ নিজেই ছবি আঁকার কাজটা করে নিতেন। আবার অনেকে জীবজন্তুর কাট আউটকে পছন্দমত জায়গায় রেখে হাতের আঙ্গুলে চাপ দিয়ে অন্য হাতে পেন্সিল দিয়ে দাগ কেটে নিতেন। তার উপর নানা রঙের সুতো দিয়ে ঐ সব ছবি গুলোকে সরু সুঁই দিয়ে খুব ছোট ছোট ফোঁড় দিয়ে কাঁথাগুলি ফুটিয়ে তুলতেন। এ এক দেখার মত শিল্প সৃস্টি। না দেখলে বোঝানো খুবই ক িন। পূর্ববঙ্গে দেখেছি বর্ষার সময়ি ঐ কাঁথা সেলাইয়ের ধুম পড়ত। বর্ষায় টিনের ছাউনির উপর বৃস্টির টাপুর টুপুর আওয়াজের গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে কাঁথার উপর সূঁচ চালাত। বর্ষার কাজ কর্ম কম থাকায় গ্রামের সবাই শিল্প কর্ম নিয়ে ব্যাস্ত থাকতেন। নিশ্চিন্ত ভাবে আপনমনে এই সূচি শিল্প চালিয়ে যেতেন। এক একটি নকসী কাঁথা রুপ দিতে দু-তিন মাসের উপর সময় লাগত। আজ কাঁথা শিল্প বিলুপ্তির পথে। আজ কালকার শহরের ছেলে-মেয়েরা অনেকেই হয়ত কাঁথা দেখে নাই। আগের কালে গ্রামের মেয়ের বিয়েতে জামাইকে ঐ সব নকসীকাঁথা উপহার দিতেন। এ এক সুন্দর, নরম, মসৃন ান্ডায় গায়ে দেওয়ার উপকরন। যাহারা গায় দিয়েছে তারাই শুধু তার স্বাদ উপভোগ করেছেন।

 

বাজারে যন্ত্রে বূনা বিছানার চাদর ও গায় দেওয়ার চাদর আসাতে কাঁথা আর চোখে পড়ে না। কাঁথা শিল্প দেখতে এখন আমাদের যেতে হবে বিভিন্ন যাদুঘরে। সবার অবগতির জন্য জানাচ্ছি দক্ষিন কলকাতার গুরুসদয় যাদুঘরে কিছু বাংলার বিভিন্ন জায়গার নকসী কাঁথা সযত্নে প্রদর্শীত হচ্ছে। অনামি শিল্পীদের এই নিপুন শিল্পকর্ম দেখলে মন ও চোখ আনন্দে ভরে যায়। শিল্পীদের নাম না থাকলেও কোন অঞ্চল বা জেলার তার বিবরন পাওয়া যায়। আজকারকার মত যদি তখন প্রচার মাধ্যম থাকত তাহলে ঐ শিল্পীরা আজ অমর হয়ে থাকতেন আজকের কোলাজ শিল্পী শাকিলার মত। কাঁথা শিল্প বিলুপ্ত হলেও আজ কাঁথা শিল্পের রুপ আধুনিক ভাবে আবার ফিরে আসছে, আধুনিকাদের শাড়ীতে, ছেলেদের পাঞ্জাবীতে। এ খুবই আনন্দের কথা কাঁথা শিল্পের রুপ নতুন ভাবে নতুন রুপে ফিরে আসায়। স্বাভাবিক ভাবেই মনে আসে কাঁথা কথাটি কি? তখনই ফিরে আসতে হয় ভারতীয় শিল্প কলার মূল মন্ত্রের কথায়। "সত্যম শিবম সুন্দরম" আমাদের কাঁথা শিল্পের পটুত্বই আমাদের বাঙ্গালী মহিলা শিল্পীদের প্রধান গৌরব। এমনকি, এই অশিক্ষিত পটুত্বে শিক্ষিত পাশ্চাত্য রুচি যেখানে হস্তক্ষেপ করেছে, সেখানই তাহার স্পর্শে শিল্পকলার মান ক্ষুন্ন হয়েছে।

 

বাংলার আর একটি সুন্দর গ্রামীন শিকা শিল্প বিলুপ্তির পথে। বাংলার ঘরে ঘরে সুন্দর ভাবে লাইন করে সাজানো থাকত পাট ও সুতোর বানান শিকা। এই শিকায় রাখা হত সাধারন তেলের বোতল থেকে শুরু করে হাঁড়ি পাতিল। পাত্রগুলি বড় থেকে ক্রমশ ছোট এক একটি করে সাজিয়ে রাখা হত গৃহস্থালির জিনিষপত্র দিয়ে। তেল থেকে শুরু করে নানান খাবার বস্তু। শিকার পাত্রগুলি রাখার পরই ফুটে উ ত শিকায় বানান জীব, জন্তু, পাখী, ফুল ও ফল, লতা-পাতার আকৃতি শিকায় রাখা পাত্রের উপর। শিকার ব্যবহার কমে গেলেও আজকাল শহরের বড় সাহেবদের বাড়ীতে ড্রইংরুমে দেখা পাওয়া যায় সাজান বস্তুর সাথে। শিকার জায়গা আজ গ্রামে নিয়েছে নানা রকম কা ের, বাঁশের তাক। এই শিল্প তৈয়ার হত সাধারন সুতো ও পাতের সুতো দিয়ে। শিকা লুপ্ত হলেও তার নাম কখনও লুপ্ত হবে না - যতদিন বালক শ্রীকৃষ্ণের মাখন চুরির গল্প ছবিটি ঘরে ঘরে থাকবে।

 

মন্তব্য (0)add comment

মন্তব্য করুন
quote
bold
italicize
underline
strike
url
image
quote
quote
smile
wink
laugh
grin
angry
sad
shocked
cool
tongue
kiss
cry
smaller | bigger

busy
 
< পূর্বে

দূর্গাপুজা

অনলাইনে কে

এই মুহূর্তে আমাদের সাথে 13 জন অতিথি অনলাইন আছেন।