2 টি মোটিভেশনাল গল্প যা তোমার জীবনে উন্নতির অনুপ্রেরণা হতে পারে।

মোটিভেশনাল গল্প

মোটিভেশনাল গল্প বা উক্তি আমাদের জীবনকে এগিয়ে নিতে ও ঘুরে দাড়ানোর মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। আমরা জীবনে ভালো মানুষ হবার অনুপ্রেরণা পাই। সেই গল্পগুলো আমরা পড়ি, আমরা জানি, তা থেকে শিক্ষাও নিই । কিন্তু সেগুলো বেশীদিন মেনে চলা হয়ে ওঠে না। তাই বার বার গল্পগুলো পড়তে হয়।

1. ঝুঁকি নিতে পারলেই জীবনে সাফল্য আসবে: একটি অনুপ্রেরনা বা মোটিভেশনাল গল্প

এক গ্রামে পিন্টু ও মিন্টু নামে দুই যুবক বাস করত । তারা দুজনেই বেকার । দিনমজুরের কাজ ছাড়া গ্রামে আর কোনো কাজই তারা দেখছে না । এইদিকে নব বিবাহিতা স্ত্রী নিয়ে দুজনের একই রকম পারিবারিক অবস্থা । ভিন্ন মানসিকতার হলেও দুজনের একটাই সাধারণ সমস্যা, আর সেটা হলো কীভাবে রোজগার করা যায় ।

এই সব ভাবতে ভাবতে পিন্টুর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল । সে মিন্টুকে বলল দুজনে মিলে যদি একটা করে গরু কেনা যায়, তাহলে কেমন হবে । গরুর দুধ বিক্রি ক’রে কিছু টাকা পাওয়া যাবে । আর গরুর বাচ্চাও হবে, ফলে গরুর সংখ্যা বাড়তে থাকবে । দুধও বেশি বেশি হবে । আর এভাবে দুজনই একদিন অনেক টাকার মালিক হয়ে যাবে । গরুর সংখ্যা যখন বাড়বে, তখন অনেক লোক রাখবে দেখাশুনার জন্য ফলে কিছু মানুষের কর্মসংস্থানও হবে —-এভাবে দুজনই একদিন ধনী হয়ে উঠবে ।

এভাবে পিন্টু তার ভাবনার কথা মিন্টুকে জানায় । এই প্রস্তাবটি মিন্টুরও খুব ভালো লাগে । সেও প্রস্তাবে রাজী হয়ে যায় । তারা দুজনে কথা পাক্কা করে ফেলে । খুব আনন্দ আর উদ্দীপনা নিয়ে দুজনেই বাড়ি যায় । দুজনেই তাদের এই উদ্যোগের কথা তাদের নিজেদের স্ত্রীকে জানায় ।

পিন্টুর স্ত্রী সব শুনে খুব আনন্দের সঙ্গে তার গয়না খুলে স্বামীর হাতে দিয়ে বলল ” খুব ভালো পরিকল্পনা, আমার গয়না বিক্রি করে গরু কেনো । যখন বেশি রোজগার হবে, তখন নাহয় আবার গয়না কেনা যাবে । ” স্ত্রীর কথায় গর্বিত হয় পিন্টু ।

এদিকে মিন্টু তার পরিকল্পনার কথা স্ত্রীকে জানালে তার স্ত্রী বলল ”দেখো একে তো আমাদের কিছুই নেই । খালি কয়েকটা মাত্র গয়না সম্বল । আর তা বিক্রি করে গরু কিনবে । কিন্তু যদি গরুটি মরে যায তখন কি হবে”।

মিন্টুর মনেও খটকা লাগে । মনে হয় তার স্ত্রী ঠিকই বলছে । কারণ গরু যদি মরে যায় তাহলে তাদের একমাত্র সম্বল গয়নাগুলিও যাবে — গরু ও যাবে । এত ঝুঁকি নেওয়াটা উচিৎ হবে না ।

পরের দিন দুই বন্ধুর দেখা হলে মিন্টু বলে ”ভাই পিন্টু, গরু যদি মরে যায় তাহলে…. ?“

পিন্টু তখন বলল ”এত নেগেটিভ চিন্তা করছিস কেন ? কেনার আগেই গরুর মরার কথা ভাবছিস ? আর গরু কোন কারণেই বা মরতে যাবে ? ”

মিন্টু একই সুরে হতাশ জবাব দেয় ”তা তো বুঝলাম যে গরু মরবে না । কিন্তু ধর, যদি মরে যায় ? তাহলে কী হবে ?“

পিন্টু অত্যন্ত স্নেহ ভ’রে জবাব দেয় “তোর ‘তাহলে’র জবাব আমার কাছে নেই । ”

মিন্টু বলে ”এই তাহলে’র জবাব আমার কাছে আছে । আমরা বরবাদ হয়ে যাবো । সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাবো ।“

অত্যন্ত বেদনাহত হয়ে পিন্টু বলল ”কিন্তু তুই কেন বার বার ভাবছিস যে গরুটা মরে যাবে …..একটু অন্যভাবে ভেবে দেখ , গরুটা দুধ দেবে । আমরা বিক্রি করবো । প্রথমে পয়সাগুলো জমাবো । তারপর আরও গরু কিনবো । অনেক পয়সা হবে যখন, তখন অনেক গয়না কেনা যাবে, বাড়িও বানানো যাবে । এভাবে দুধের বড় ব্যবসায়ী হয়ে উঠব দুজন । ”

কিন্তু মিন্টুর ওই এক কথা এক যুক্তি ”ব্যবসা টাকা বাড়ি গয়না সব হবে তখনই, যখন গরুটা বেঁচে থাকবে । ”

এরপর অনেক বোঝানোর পরেও মিন্টু তোতাপাখির মতো বলতে থাকে গরু মরার কথা ।

পিন্টু আর বোঝাতে পারে না শুধু বলে ”দেখ মিন্টু, ঐরকম ভাবলে তুই কোনোদিনও কোনো কাজ করতে পারবি না । এই ধরণের ভাবনা ঠিক নয় । কারণ তুই আগে অন্ধকার দিকটাই দেখছিস । ” এইভাবে দুই বন্ধুর তর্কের পর কয়েকদিন গেল । পিন্টু একাই একটা দুগ্ধবতী গরু কিনে ফেলল । সে এখন আর দিন মজুরের কাজ করে না । সকাল থেকে সন্ধ্যা গরুর দেখাশুনা করে, দুধ দোয় । প্রথম কিছুদিন দুধের ক্রেতা খুঁজতে, গরুর পরিচর্যা করতে কষ্ট হয়েছিল । কিন্তু ধীরে ধীরে পিন্টু এই কাজগুলোতে দক্ষ হয়ে উঠতে লাগলো ।

ঝুঁকি নিতে পারলেই জীবনে সাফল্য আসবে
Picture credit: padmatimes24.com

আর দিনমজুরের কাজের শেষে মিন্টু রোজ তার কাছে আসতো, আর পিন্টুর সংঘর্ষ করার, পরিশ্রমের বিষয়টি দেখতো । আর ভাবতো তাদের দিনমজুরের জীবন কত ভালো ছিল । রোজ সকালে কাজে যেত আর বিকেলে ফিরে এসে সন্ধ্যায় কাজ কর্মহীন আড্ডা দিতে পারত । এখন পিন্টুর জীবনে আড্ডা দেবার অবসর নেই । তার উপর এত ঝুঁকি নিয়ে কেন যে গরু কিনলো । গরু যদি মরেই যায় । সবই যাবে তার ।

আর ঐ দিকে কালো গরুর মধ্যেই জীবনের আলো দেখতে পায় পিন্টু । সে দ্বিগুন উৎসাহে কাজ করতে লাগলো । এটা ঠিক যে তার কাছে এখন অবসর নেই । কিন্তু সুন্দর ভবিষ্যতের কল্পনায় সময় নষ্ট করতে সে রাজি নয় ।

এইভাবে দিন যায় । আস্তে আস্তে তার ক্রেতা বাড়তে থাকে । গরু বাড়তে থাকে । কাজের লোকও বাড়তে থাকে । গরু ও তার মরে নি । অন্যদিকে মিন্টু গরু মরার কথা ভাবে আর একইভাবে দিনমজুরের কাজ করে যায় । এদিকে পিন্টু ধীরে ধীরে ধনী হতে থাকে ক্রমশঃ ।

বন্ধুরা – এই গল্পের অন্তর্নিহিত অর্থ যদি আমরা বুঝতে পারি, তাহলে আমাদের জীবনে পদক্ষেপ নেওয়ার শিক্ষাটি অর্জন করতে পারবো ।

এসো খুব কম কথায় দেখে নেই আমরা শিখলাম:-

  • কিন্তু‘, ‘যদি‘, ‘তবে‘ ইত্যাদির জালে আটকে পড়ে থাকতে নেই ।
  • নেতিবাচক ভাবনা কখনোই মাথায় আনতে নেই ।
  • নো রিস্ক, নো গেইন‘ অর্থাৎ ঝুঁকি নিতে পারলেই জীবনে সাফল্য আসবে ।

আরও পড়ুন: তিমুন মাস – ইন্দোনেশিয়ার জাভা অঞ্চলের একটি জনপ্রিয় লোককথা

2. ‘আজ’- এটাই একমাত্র সত্য : অনুপ্রেরনামূলক বা মোটিভেশনাল গল্প

আজ – এটাই একমাত্র সত্য‘ কোন কাল্পনিক গল্প নয় । এটা চার্লস ক্যাটারিং ‘এর জীবনের একটা অংশ। এই মোটিভেশনাল গল্প আমাদের উদ্বুদ্ধ করে সফলতার দিকে যেতে।

অনেকদিন আগের কথা । একটা সময় ছিল যখন মোটর গাড়ি স্টার্ট করতে হতো ইংরেজি Z অক্ষরের মতো একটা হ্যান্ডেল দিয়ে । অনেক পরিশ্রম, শক্তি ও সময় ব্যায় ক’রে গাড়িগুলো স্টার্ট করতে হতো । অর্থাৎ সেই সময় যে কোনো গাড়ি স্টার্ট করা ছিল একটা রীতিমতো হুজ্জতির ব্যাপার ।

একজন তরুণ যুবক যিনি ছিলেন ‘জেনারেল মোটর্স রিসার্চ কর্পোরেশনের ‘ ভাইস প্রেসিডেন্ট । তিনি বন্ধুদের বললেন যে একটা ছোট্ট চাবি দিয়ে গাড়িগুলো স্টার্ট করা যেতে পারে । কিন্তু বন্ধুরা হেসে উড়িয়ে দিলেন তার কথাটি । এবং যারা শুনলেন সকলেই বললেন যে , অসম্ভব কল্পনা তার । আর তার খেয়ালি কল্পনার জন্য মজাও করতে ছাড়লেন না । বললেন যে , “একটা ছোট্ট চাবি দিয়ে এত বড় মোটর গাড়িকে স্টার্ট করা সম্ভব নয় ।” কিন্তু আজ আমরা জানি যে এটাও সম্ভব হয়েছে । এখন একটা ছোট্ট চাবি দিয়ে অর্থাৎ সেল্ফ স্টার্টারের মাধ্যমে গাড়ি স্টার্ট করা যায় ।

কীভাবে এটা সম্ভব হলো ? এবার সে বিষয়ে বলা যাক।

চার্লস ফ্রাঙ্কলিন ক্যাটারিং

তার নাম চার্লস ফ্রাঙ্কলিন ক্যাটারিং (Charles Franklin Kettering) । সংক্ষেপে চার্লস এফ ক্যাটারিং নামেই পরিচিত আজ । যিনি এই অসাধ্য সাধন করতে পেরেছিলেন । তিনি যখন গাড়ির সেল্ফ স্টার্ট এর আবিষ্কারের স্বপ্ন দেখতেন । তখন তার এই স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রয়োজন ছিল প্রচুর সময় এবং পরিশ্রম । বাধ্য হয়েই তিনি চাকরিটি ছেড়ে দেন । যে কোনো গবেষণার জন্য অর্থেরও প্রয়োজন । চাকরি না থাকায় তাঁর অর্থের অভাব দেখা দিল । তাঁর ব্যাংক ব্যালান্স ফুরোতে লাগলো । একটা সময় সবই ফুরিয়ে গেল ।

তখনও চার্লস ক্যাটারিং সফল হতে পারলেন না । একটার পর একটা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে লাগলো । গবেষণা চালিয়ে যাবার জন্য আরো পয়সার প্রয়োজন হতে লাগলো । হতাশ হয়ে কাজ বন্ধ করে দেবেন , নাকি কাজ চালিয়ে যাবেন । তিনি জমি জমা গয়না ইত্যাদি বিক্রি করতে লাগলেন । একটা সময় সেসবও ফুরিয়ে গেল । শেষ সম্বল রইলো পৈতৃক সম্পত্তি চাষের খেত আর বসত বাড়িটি । পৈতৃক সম্পত্তি আর ফিরে পাওয়া যায় না , তাই তিনি বসত বাড়িটি বিক্রি করে দিলেন । আর ক্ষেতের এক ধারে কুঁড়ে ঘর বানিয়ে স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে বাস করতে লাগলেন ।

গভীর গবেষণায় তিনি এতই নিমগ্ন যে , আত্মীয় বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে লাগলেন । তার উপর বন্ধু , আত্মীয় সকলেই তার স্ত্রীকে বললেন যে তিনি কেন এত পাগলামি মেনে নিচ্ছেন ? সন্তানদের ভবিষ্যৎ নেই ?

কিন্তু তাঁর স্ত্রী বললেন যে তারা তো কষ্ট করছেনই , কিন্তু ক্যাটারিং সাহেব নিজে যে এত পরিশ্রম করছেন নিজের শরীরের দিকে তাকানোর পর্যন্তও অবসর নেই -এটাই তাকে বেশি চিন্তায় রাখছে । অর্থাৎ তার স্ত্রী স্বামীর কাজকে, তার অধ্যবসায়কে সমর্থনই করছেন ।

আরও পড়ুন: ভারতীয় রসায়নের জনক ও এক মনীষী

এত কিছু সত্ত্বেও চার্লস ক্যাটারিং কিন্তু বিশ্বাসে অটল ছিলেন যে , তিনি একদিন সফল হবেন । দীর্ঘ কয়েক বছর পর অবশেষে তাঁর স্বপ্ন সফল হলো । তিনি যেদিন সেল্ফ স্টার্টের প্রদর্শন করেন , সে দিন সকলেই অবাক । সমস্ত মোটর শিল্পের লোকেরা তার টেকনিক কিনে নিতে লাগলেন আর দেখতে দেখতে তিনি অনেক অর্থের মালিক হয়ে উঠলেন ।

বিশ্বের বিখ্যাত সব পত্র পত্রিকা তাঁকে ঘিরে ধ’রে তাঁর সাফল্যের কারণ জানতে চাইলো । ” অনেক অনেক বাধার পরেও নিজের লক্ষ্য পূরণ করেই ছাড়লেন , আপনার এতো ধৈর্যের উৎস কী ? ”

এর উত্তর দেওয়ার জন্য ক্যাটারিং সাংবাদিককে তাঁর সেই কুঁড়ে ঘরে নিয়ে গেলেন , আর ঘরের সমস্ত জিনিসের মাঝে থেকে একটা ছোট্ট পাথর বের করে দেখালেন আর বললেন , ” এটাই আমার সাফল্যের চাবিকাঠি “।

দেখা গেল সেই পাথরে লেখা ছিল একটি ছোট্ট কথা “আজ” । তিনি বললেন ” এই ‘আজ’ই আমার সফলতার উৎস । কারণ গতকাল মানুষের জীবনে হতাশা এনে দেয় , আগামী কাল এনে দেয় অলসতা । তাই আজই একমাত্র সত্য । আর তাই দেখুন আজ আমি সফল । ”

তাহলে বন্ধুরা , দেখো এই গল্প থেকে আমরা যে শিক্ষাগুলি নিতে পারি সেগুলি হলো :-

  • যারা ‘আজ’ নিয়ে বাঁচে তারাই সফল হয়
  • দুনিয়ার সমস্ত কাজ আসলে ‘আজ’ই সম্পন্ন হয় ।
  • তাই বর্তমানকে নিয়ে বাঁচাই সাফল্যের মূল সূত্র ।
  • এখন নয় তো কক্ষণো নয়
  • প্রতিটি সময়ই মূল্যবান । তাই সময়ের সঠিক ব্যবহার করা উচিত ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top